তারাবির নামাজ
যেকোনো পরীক্ষায় ভালো ফলাফল অর্জনের জন্য কঠোর পরিশ্রম ও সাধনা করতে হয়। দুনিয়াটা একটা পরীক্ষার হল। দুনিয়ার পরীক্ষায় যারা ভালো ফলাফল করতে পারবে পরকালে তারা জান্নাতবাসি হবে। দুনিয়াতে কঠিন কাজ গুলোর একটি হল রোজা রাখা। আর এই কঠিন কাজের শেষে সারাদিন পরে রাতে আবার তারাবির নামাজ। এ যেন কষ্টের পরে কষ্ট। কিন্তু এর ফলাফল খুব মধুর অর্থাৎ জান্নাত। তবে মনে রাখতে হবে দুনিয়াটা মুমিনদের জন্য কষ্টের জায়গা কিন্তু বেইমানদের জন্য সুখের স্বর্গ।
রোজা ও তারাবিৱ নামাজ কঠিন হলেও আল্লাহ তাআলা মুমিন ব্যক্তিদের জন্য সহজ করে দেন। অনেক মানুষ রোজা রাখে কিন্তু তারাবির নামাজ পড়ে না। এর অর্থ হল তারা ফরজ মানে কিন্তু সুন্নত মানে না। তারাবির নামাজ সুন্নত। তাই এটাও মনে রাখতে হবে যে রাসূল সাল্লাহু সাল্লামকে বাদ রেখে কখনো আল্লাহকে পাওয়া যাবে না। তাই রোজা রাখার সাথে সাথে প্রত্যেক রোজাদার ব্যক্তির তারাবির নামাজ পড়তে হবে। অনেক মানুষ তারাবির নামাজ সঠিকভাবে পড়তে জানে না। তাই আজ আমি আমার এই আর্টিকেলে ঐ সমস্ত মানুষের জন্য তারাবির নামাজের নিয়ম ও তারাবির নামাজের দোয়া সহ তারাবির নামাজ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব। শুধুমাত্র আপনি আর্টিকেলটি মন দিয়ে পড়ুন। আপনি আর্টিকেলটি পড়লে তারাবির নামাজ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারবেন।
তারাবির নামাজের নিয়ম
পৃথিবীতে প্রতিটা কাজের একটি নিয়ম আছে। নিয়ম ছাড়া কোন কাজ করা যায় না। ঠিক তেমনি অন্যান্য নামাজের মত তারাবির নামাজেরও নিয়ম আছে। যখন খুশি তখন তারাবির নামাজ পড়া যায় না। এশার চার রাকাত সুন্নত, চার রাকাত ফরজ ও দুই রাকাত সুন্নত পড়ার পরে তারাবির নামাজ পড়তে হয়। আর তারাবিৱ নামাজ শেষে তিন রাকাত বেতের পড়তে হয়। তারাবি নামাজ শুরু করার পূর্বে তারাবির নামাজ কত রাকাত এবং তারাবির নামাজের নিয়ত জেনে নিন।
তারাবির নামাজ কত রাকাত
তারাবির নামাজ কেউ চার রাকাত, কেউ
আট রাকাত, কেউ বার রাকাত আবার বেশিরভাগ বিশ রাকাত পড়ে।
কিন্তু অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে আসলে তারাবির নামাজ কত রাকাত। প্রকৃতপক্ষে, তারাবির নামাজের নির্দিষ্ট কোন রাকাত নেই। হানাফী শাফিঈ ও হাম্বলী
ফিকহের অনুসারীরা ২০ রাকাত, মালিকি ফিকহের অনুসারীরা ৩৬ রাকাত এবং আহলে হাদিস অনুসারীরা ৮ রাকাত
করে তারাবির নামাজ পড়েন। আবার কেউ সারাদিন রোজা রাখার পরে
এক রাকাতও তারাবি নামাজ পড়েন না। এরা যে কোন অনুসারী তা
আমার জানা নেই।
তারাবির নামাজের নিয়ত
তিন ভাবে তারাবি নামাজের নিয়ত করা যায়। যদি আপনি আরবি পড়তে পারেন তাহলে আরবীতে দেখে তারাবির নামাজের নিয়ত মুখস্ত করে নেন। যদি আপনি আরবি পড়তে না পারেন তাহলে তারাবির নামাজের বাংলা উচ্চারণ দেখে নিয়ত মুখস্ত করে নেন। আর যদি আপনার মুখস্ত করার শক্তি না থাকে তাহলে বাংলা অর্থ দেখে তারাবির নামাজের নিয়ত মুখস্ত করেন। আপনার সুবিধার্থে তারাবির নামাজের নিয়ত আরবি, বাংলা উচ্চারণ ও বাংলা অর্থ নিম্নে তুলে ধরা হলো।
তারাবির নামাজের নিয়ত বাংলা উচ্চারণ
নাওয়াইতুয়ান উসালিয়া লিল্লাহি তা'আলা, রাক'আতাই সালাতিল তারাবিহ সুন্নত রাসূলুল্লাহি তাআলা + মুতাওয়াযজ্জিহান ইলা জিহাতিল কাবাতিশ শারিফাতি, আল্লাহু আকবার।
(যদি জামাতের সহিত তারাবির নামাজ পড়েন তাহলে যোগ চিহ্নের পরে ইক্বতাদাইতু বি হাজাল ইমান পড়বেন।)
তারাবির নামাজের নিয়ত বাংলা অর্থ
আমি কিবলামুখী হইয়া দুই রাকাত
তারাবিহ সুন্নত নামাজ + পড়িতেছি আল্লাহু আকবার।
(যদি জামাতে পড়েন তাহলে যোগ চিহ্নের পরে জামাতের সহিত এই ইমামের পিছনে পড়বেন।)
তারাবির নামাজের নিয়ম কানুন
তারাবির নামাজ পাঁচ ওয়াক্ত
নামাজের মতই। শুধুমাত্র তারাবির নামাজে একটি দোয়া পড়তে হয় এবং আলাদা একটি
মোনাজাত করতে হয়। যদি আপনার তারাবির নামাজের দোয়া ও মুনাজাত মুখস্ত না থাকে
তাহলে এর জন্য অপশন আছে। এখন আপনি বাসায় একা একা তারাবির নামাজ কিভাবে আদায়
করবেন সেটা ধারাবাহিকভাবে দেখে নিন।
১। এশার
চার রাকাত সুন্নত নামাজ পড়ুন। এটি না পড়তে চাইলে সমস্যা নাই। তারপরেও রমজান মাসে
যত বেশি ইবাদত করবেন তত বেশি আপনার লাভ।
২। এশার
চার রাকাত ফরজ নামাজ পড়ুন।
৩। এশার
দুই রাকাত সুন্নত নামাজ পড়ুন।
৪। এখন
দুই রাকাত তারাবির নামাজের নিয়ত করুন।
৫। অন্যান্য
নামাজের মত দুই রাকাত নামাজ পড়ুন। এর জন্য আলাদা কোনো সূরা
নাই।
৬। দুই রাকাত নামাজ শেষে আবার দুই রাকাত তারাবির নামাজের নিয়ত করুন এবং পূর্বের মত দুই রাকাত তারাবির নামাজ পড়ুন।
৭। চার
রাকাত শেষে তারাবির নামাজের দোয়া পড়ুন। যদি তারাবির নামাজের দোয়া মুখস্থ না
থাকে তাহলে তার পরিবর্তে তিন বার বিসমিল্লাহ সহ সূরা ইখলাস পড়ুন।
৮। তারাবির নামাজের দোয়া শেষে তারাবির নামাজের মোনাজাত করুন। যদি আপনার তারাবির নামাজের মোনাজাত না মুখস্থ থাকে তাহলে তার পরিবর্তে আপনার যে মোনাজাত জানা আছে তাই পড়ুন।
প্রতি চার রাকাত শেষে তারাবির নামাজের দোয়া ও মোনাজাত করতে হয়। চার রাকাত শেষে মোনাজাত করতে না চাইলে তারাবির নামাজ শেষে একবারে মোনাজাত করতে পারেন।এতে কোন সমস্যা নাই। চার চার রাকাত করে বিশ রাকাত তারাবির নামাজ পড়ুন। এখন তারাবির নামাজের দোয়া ও মোনাজাত জেনে নিন।
পড়তে পারেনঃ
তারাবির নামাজের দোয়া
তারাবির নামাজের দোয়া বাংলা উচ্চারণ
সুবহানাজিল মুলকি ওয়াল মালাকুতি, সুবহানাজিল ইজ্জাতি, ওয়াল আযমাতি, ওয়াল হাইবাতি, ওয়াল কুদরাতি, ওয়াল কিবরিয়াই, ওয়াল যাবারুত। সুবহানাল্ মালিকিল হাইয়িল্লাজি লা ইয়ানামু ওয়ালা ইয়ামুতু আবাদান আবাদা। সুব্বুহুন কুদ্দুসুন রাব্বুনা ওয়া রাব্বুল মালাইকাতি ওয়ার রুহ।
তারাবির নামাজের দোয়া বাংলা অর্থ
আল্লাহ পবিত্রময়, সাম্রাজ্য ও মহাত্মের মালিক। তিনি পবিত্রময়, সম্মান, মহত্ব ও প্রতিপত্তিশালী সত্তা। তিনি ক্ষমতাবান, গৌরবময় ও প্রতাপশালী। তিনি পবিত্রময় ও রাজাধিরাজ যিনি চিরঞ্জীব, কখনো ঘুমায় না এবং চির মৃত্যুহীন সত্তা। তিনি পবিত্রময় ও বরকতময় আমাদের প্রতিপালক। ফেরেশতাকুল এবং জিব্রাইলের (আ:) এর প্রতিপালক।
তারাবির নামাজের মোনাজাত
তারাবির নামাজের মোনাজাত বাংলা উচ্চারণ
আল্লাহুম্মা ইন্না নাসআলুকাল জান্নাতা ওয়া নাউযুবিকা মিনান্নার। ইয়া খালিক্বাল জান্নাতি ওয়ান নার।বিরাহমাতিকা ইয়া আঝিঝু ইয়া গাফফার, ইয়া কারিমু ইয়া সাত্তার, ইয়া রাহিমু ইয়া জাব্বার, ইয়া খালিকু ইয়া বাররু। আল্লাহুম্মা আঝিরনা মিনান্নার। ইয়া মুঝিরু, ইয়া মুঝিরু, ইয়া মুঝির। বিরাহমাতিকা ইয়া আরহামার রাহিমিন।
তারাবির নামাজের মোনাজাত বাংলা অর্থ সহ
তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করছি যিনি ইহজগত ফেরেশতা ও জগতের মালিক। সেই আল্লাহর মহিমা বর্ণনা করছি যিনি মহিমাময়, অনেক বড় ভীতিপূর্ণ, শক্তিময়, গৌরবময় এবং বৃহত্তর। আমি সেই প্রতিপালকের গুনোগান করছি যিনি চিরঞ্জীব, তিনি কখনো নিদ্রায় যান না এবং যার মৃত্যু নেই। তিনি পূতপবিত্র। তিনি আমাদের ফেরেশতাকুলেৱ এবং সমস্ত আত্মা সমূহেৱ পালনকর্তা। আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই। আমরা আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি, বেহেশত কামনা করছি এবং দোযখ থেকে মুক্তি চাচ্ছি।
তারাবির নামাজ সুন্নত নাকি নফল
সারাদিন রোজা রাখার পরে রাতে তারাবির নামাজ পড়া নিঃসন্দেহে একটি কঠিন কাজ। তারপরেও তারাবির নামাজ পড়ার জন্য রাসূল সাল্লাহু আলাই সালাম তার উম্মতদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি নিজে তারাবির নামাজ পড়তেন এবং সাহাবাদেরকে তারাবি নামাজ পড়ার জন্য নির্দেশ দিতেন। তিনি কখনো আট রাকাত, কখনো ষোল রাকাত এবং বেশিরভাগ সময় বিশ রাকাত তারাবির নামাজ পড়তেন। তারাবির নামাজ পড়তে অনেক সময় লাগে। এজন্য প্রতি চার রাকাতের শেষে বসে বিশ্রাম করতে হয় এবং এই বিশ্রাম এর মধ্যে দোয়া দরুদ পড়তে হয়। শুধুমাত্র বিশ্রামের কারণে এর নাম সালাতুত তারাবিহ বা তারাবির নামাজ বলে। এই নামাজ পড়ার জন্য রাসূল সাল্লাহু আলাই সালাম জোরালো নির্দেশ দিয়েছেন। তাই তারাবির নামাজ সুন্নতে মুয়াক্কাদা বা জরুরী সুন্নত।
উপসংহারে বলা যায় যে রোজাকে পরিপূর্ণ করতে তারাবি নামাজের গুরুত্ব অপরিসীম। তারাবির নামাজকে
কখনো অস্বীকার করা যাবে না। অস্বীকার করলে রাসূল সা: এর সুন্নতকে অস্বীকার করা
হবে। এছাড়াও তারাবির নামাজের অনেক ফজিলত আছে। এ প্রসঙ্গে রাসূল সা: বলেছেন,
" যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে পুণ্য লাভের আশায় রমজানের রাতে
তারাবির নামাজ আদায় করে তার অতীতের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।" তিনি আরো বলেছেন," যে ব্যক্তি ঈমান ও
ইহতিসারের সাথে সওয়াব প্রাপ্তির আশায় রোজা রাখে, তারাবির
নামাজ পড়ে এবং কদরের রাতে জাগ্রত থেকে আল্লাহর ইবাদত করে তার জীবনের পূর্বের সব
গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে।" তাই প্রত্যেক রোজাদার ব্যক্তির তারাবির
নামাজের নিয়ম ও তারাবির নামাজের দোয়া সহ
তারাবির নামাজ সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে সহীহভাবে তারাবির নামাজ পড়া উচিত।
রিলেটেড পোস্টসঃ
একাডেমিক শিক্ষা বিষয়ক অজানাকে জানতে নিয়মিত আমার ব্লগ সাইটটি পরিদর্শন করুন। আমার ব্লগ সাইটটি পরিদর্শনের জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।


